জ্বালানি খরচ এড়াতে ঘোড়া দিয়ে চলছে জমি চাষ
আদিম যুগে ফিরছে কৃষি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৭-০৯-২০২৬ ০২:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৭-০৯-২০২৬ ০২:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের দাপটে কৃষি জমি গরু-মহিষ দিয়ে চাষ দেওয়া প্রায় হারিয়ে গেছে। তবে, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়াকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কয়েকজন। বাড়তি জ্বালানি খরচ এড়াতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও এই ব্যবস্থায় জমি চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের গোন্তা গ্রামের একটি জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দিচ্ছেন কৃষক শফিকুল ইসলাম। কাদামাটিতে ঘোড়াটিকে নিয়ন্ত্রণ করে জমির উঁচু-নিচু অংশ সমান করছিলেন তিনি।
শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ২৪ হাজার টাকা দিয়ে ঘোড়াটি কিনেছিলেন। এরপর থেকে বিভিন্ন কৃষকের জমি চাষ ও মই দেওয়ার কাজে ঘোড়াটি ব্যবহার করছেন। বর্তমানে এটিই তার আয়ের অন্যতম মাধ্যম।
তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমিতে মই দেওয়ার জন্য ২৫০ টাকা নেন। দিনে প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে মই দিতে পারেন। এতে দৈনিক আয় হয় প্রায় ১২৫০ টাকা। আমন ও বোরো- দুই মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। বীজতলা তৈরির কাজেও ঘোড়াটি ব্যবহার করেন তিনি।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, তাড়াশে গরুর জোয়াল-মই এখন প্রায় নেই। কোথাও কোথাও মহিষ দিয়ে মই দেওয়া হলেও প্রয়োজনের সময় ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার পাওয়া যায় না। আবার আধুনিক যন্ত্রে চাষের খরচও তুলনামূলক বেশি। এ কারণে কম খরচে ঘোড়ার হাল ও মইয়ের দিকে ঝুঁকছেন কেউ কেউ।
কৃষকদের ভাষ্য, ঘোড়ার মই দিয়ে জমির মাটি ভালোভাবে সমান করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী একই জায়গায় কয়েকবার ঘোরানো সম্ভব হওয়ায় জমির উঁচু-নিচু অংশও ঠিকভাবে সমান হয়। এতে সেচের পানি জমিতে সমভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষকদের ভাষ্য, ঘোড়ার মই দিয়ে জমির মাটি ভালোভাবে সমান করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী একই জায়গায় কয়েকবার ঘোরানো সম্ভব হওয়ায় জমির উঁচু-নিচু অংশও ঠিকভাবে সমান হয়। এতে সেচের পানি জমিতে সমভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
তালম ইউনিয়নের জন্তিপুর গ্রামের আয়জদ্দি ফকির আগে ঘোড়ার গাড়িতে ধান ও বিভিন্ন মালামাল পরিবহন করতেন। পরে ঘোড়া দিয়ে জমিতে মই দেওয়ার কাজ শুরু করেন। এখন তার নাতি আশরাফুল ইসলামও একই কাজ করছেন।
আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রায় চার বছর আগে বোরো মৌসুমে তাঁর নানা তাড়াশে ঘোড়ার জোয়াল-মইয়ের কাজ শুরু করেন। পরে আরো কয়েকজন এ কাজকে পেশা হিসেবে নেন। তিনিও আমন ও বোরো মৌসুমে ঘোড়া দিয়ে মই দেন। দিনে কমপক্ষে ১০ বিঘা জমিতে মই দেওয়া যায়। প্রতি বিঘায় ২০০ টাকা করে পাওয়া যায়।
তাড়াশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী সিংড়া ও গুরুদাসপুর উপজেলাতেও কয়েকজন ঘোড়া দিয়ে জমিতে মই ও হাল দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
সিংড়ার মোখলেছুর রহমান জানান, শুরুতে ঘোড়ার গাড়িতে মালামাল পরিবহন করতেন। পরে আরো একটি ঘোড়া কিনে প্রশিক্ষণ দিয়ে জমি চাষ শুরু করেন। এখন প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন বিঘা জমি চাষ করতে পারেন। এতে আয় হয় ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা। তবে দুটি ঘোড়ার খাবার বাবদ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়।
মোখলেছুর রহমানের দাবি, ঘোড়ার হালে জমি তুলনামূলক ভালোভাবে চাষ হয়। ইরি-বোরো মৌসুমে এ কাজের চাহিদা আরো বাড়ে। অনেক কৃষক এখন পাওয়ার টিলারের পরিবর্তে ঘোড়ার হাল দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন।
কৃষক হযরত আলী জানান, এলাকায় গরুর হাল নেই। আবার প্রয়োজনের সময় পাওয়ার টিলারও পাওয়া যায় না। তাই কম খরচে ঘোড়ার হাল দিয়ে জমি চাষ করাচ্ছেন তারা।
ট্রাক্টর চালক সেরাজুল বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি চাষের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে বিঘাপ্রতি চাষাবাদে কৃষকদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। ফলে খরচ কমাতে অনেক কৃষক ট্রাক্টরের পরিবর্তে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ করছেন। ঘোড়া দিয়ে চাষে জ্বালানি খরচ না থাকায় ব্যয় তুলনামূলক কম পড়ে।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহারের কারণে বর্তমানে ঘোড়া দিয়ে জমি চাষের ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। তবে প্রয়োজন ও বাড়তি আয়ের জন্য উপজেলার কিছু কৃষক ঘোড়া দিয়ে জমি চাষ ও মই দেওয়ার কাজ করছেন। কৃষি বিভাগ কৃষকদের আধুনিক ও উন্নত কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে।
ট্রাক্টর-পাওয়ার টিলারের যুগে তাড়াশের মাঠে ঘোড়ার হাল যেন পুরোনো কৃষিচিত্রেরই এক ঝলক। তবে সেই পুরোনো পদ্ধতিই এখন কয়েকজনের জীবিকার পাশাপাশি কম খরচে চাষাবাদের বিকল্প হয়ে উঠেছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স